তাজা খবর:
Home / breaking / মুক্তাগাছার প্রসিদ্ধ মিষ্টান্ন মন্ডা
মুক্তাগাছার প্রসিদ্ধ মিষ্টান্ন মন্ডা

মুক্তাগাছার প্রসিদ্ধ মিষ্টান্ন মন্ডা

মেফতাহ আল তামিমঃ-আজ জগৎ বিখ্যাত মুক্তাগাছার মন্ডার ইতিহাস নিয়ে কিছু কথা লিখব। আমি নিজে এই মুক্তাগাছা এলাকার মানুষ। তাই ভালোবাসাটাও একটু বেশি হ্রদয় থেকে আবগে জড়ানো। আর এ এলাকার মানুষ হওয়ায় আমাকে অনেকেই মন্ডার দেশের মানুষ নামে আখ্যায়িত করে। ১৮২৪ সালে এই মিষ্টি মুক্তাগাছার মন্ডা প্রথম তৈরি করেন রাম গোপাল পাল।
মুক্তাগাছার জমিদার শ্রীকৃষ্ঞ্চ আচার্য ১৭২৭ খ্রীষ্টাব্দে নবাব আলীবদ্দী খাঁর নিকট হতে আলাপসিংহ পরগণার জমিদারী তাঁর নামে বন্দোবস্ত নিয়ে বগুড়ার ঝাঁকড়ে বসবাসরত অবস্থায় বার্ধক্য জনিত কারণে পরলোক গমন করেন। পিতার মৃত্যুর পর তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র রামরাম আর্চায্য নতুন জমিদারিতে বসবাসের উদ্দেশ্যে মুক্তাগাছা আসেন। পূর্বে মুক্তাগাছার নাম ছিল বিনোদবাড়ি।
ঐতিহ্যবাহী খ্যাতিসম্পন্ন রসনা তৃপ্ত মিষ্টান্ন মন্ডা মুক্তাগাছার ইতিহাসের সাথে জড়িয়ে আছে । মানুষ মাত্রই রসনাবিলাসে আসক্ত। নানান রকম খাবার, মিষ্টি ও মিষ্টান্ন এবং এর পরিবেশনা নিয়ে বিভিন্ন অন্চলে রয়েছে নানান মুখরোচক গল্প । মুক্তাগাছার মন্ডার নিয়েও রয়েছে অনেক প্রবাদ ও গল্প ।
মুক্তাগাছার মন্ডার নাম শুনেনি এমন লোক বাংলাদেশ তথা বাঙ্গালী সমাজে পাওয়া ভার। এ মন্ডার খ্যাতি আর স্বাদের কথা শুনলে যে কারো জিভে জল এসে যায়। প্রায় ২’শ বছর ধরে মাথা উঁচু করে আপণ স্বাদে গুনে মানে সমৃদ্ধ এ মন্ডা আজও কদর ধরে রেখেছে।
বিবাহ, সুসংবাদ, সামাজিক কিংবা রাষ্ট্রীয় যে কোন অনুষ্ঠানে মুক্তাগাছার মন্ডা ছাড়া পূর্নতা ভাবাই যায় না। মুক্তাগাছার মন্ডার আবিষ্কারক গোপাল পালের এ মন্ডা দেশের সীমানা পেরিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ভোজন বিলাসী মানুষের মাঝে নিজের শীর্ষে অবস্থান ধরে রেখেছে।
কিংবদন্তি এ মন্ডার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ময়মনসিংহ ও মুক্তাগাছার ইতিহাস। মুক্তাগাছার ইতিহাসের সঙ্গে এ মন্ডা যুক্ত হয়ে এ এলাকাকে করেছে আরও সমৃদ্ধ।

মুক্তাগাছার মন্ডা আসলে একপ্রকার সন্দেশ। গরুর দূধকে ভাল ভাবে চুলায় জাল দিয়ে তা থেকে ছানা বের করা হয়। গরুর দুধের ছানা ও চিনি দিয়ে মন্ডা তৈরী করা হয়। মন্ডা মিষ্টি আরো বেশ কয়েকটি জেলায় পাওয়া যায়। মুক্তাগাছার মন্ডা চার কোন আকৃতির । রং সাদা । মন্ডা তৈরীর পর মসৃন পাতলা হাইজেনিক কাগজ দ্বারা সুন্দর ভাবে মোড়ানো হয় ।
বাংলাদেশের কোথাও কাগজ মোড়ানো মিষ্টি সচারাচর চোখে পড়ে না । সামান্য এ বৈচিত্রতা মুক্তাগাছার মন্ডাকে দিয়েছে ভিন্ন আংগিক ও ভিন্নমাত্রা । সুদক্ষ কারিগররাই জানেন মন্ডা তৈরীর গোপন রহস্য।
জনশ্রুতি আছে প্রায় ২’শ বছর আগে মন্ডার স্বাপ্নিক রাম গোপাল পাল ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার জমিদার পরিবারকে তুষ্ট করার জন্য এ মন্ডা প্রস্তুত করেন। সেই সময়ে মুক্তাগাছার জমিদার সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরীকে মন্ডা দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়। মহারাজা এ মিষ্টান্ন খেয়ে ভূয়সী প্রশংসা করেন। ময়মনসিংহ জেলা শহর থেকে ১৬ কিলোমিটার পশ্চিমে মুক্তাগাছা জমিদার বাড়ির কাছেই পূর্ব দিকেই রাম গোপাল পালের মন্ডার দোকান।
বৃটেনের রানী এলিজাবেথ আলেকজান্দ্রা মেরি বা দ্বিতীয় এলিজাবেথ রাষ্ট্রীয় সফরে বাংলাদেশে এলে তার খাদ্য তালিকা মন্ডা দেওয়া হয় । মেন্ডা খেয়ে তিনি ভূয়সী প্রশংসা করেন । সেতারা বাদক ও সুর সম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, বিখ্যাত চিকিৎসক ডা: বিধান চন্দ্র রায়, যানি পরবর্তীতে পশ্চিমবঙ্গের মূখ্যমন্ত্রী ছিলেন, নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রমুখ। জমিদার সূর্যকান্তের পুত্র মহারাজা শশী কান্ত আচার্য্য চৌধুরী একবার রাশিয়ার নেতা স্ট্যালিনকে মন্ডা পাঠান। মন্ডা খেয়ে তিনি মন্ডার প্রশংসা পত্র প্রেরন করেন। মন্ডার ভক্ত ছিলেন তদানিন্তন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ফিল্ড মার্শাল মোহাম্মদ আইয়ুব খান।
জমিদারদের প্রিয় পছন্দের মিষ্টান্ন মন্ডার খ্যাতি তাদের হাত ধরেই ক্রমশ দেশের সীমানা পেরিয়ে বিভিন্ন উপমহাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। দেশ-বিদেশের বিখ্যাত ব্যক্তিরা মুক্তাগাছার মন্ডা খেয়েছেন। উচ্চবিত্তের এ মিষ্টান্ন কালক্রমে সর্বসাধারনের খাবারে পরিনত হয়েছে ।
মন্ডা তৈরির পেছনে রয়েছে অলৌকিক ঘটনা। মন্ডার স্বাপ্নিক গোপাল পাল খুবই ইশ্বর ভক্ত ছিলেন। পরপর কয়েক রাতে স্বপ্নে এক সন্ন্যাসী তাকে মন্ডা তৈরির পদ্ধতি শেখান। আর সন্ন্যাসী গোপালের মাথায় হাত রেখে বলেন তোর তৈরী মন্ডা একদিন জগৎ বিখ্যাত হবে।এ আশীর্বাদ করে সন্ন্যাসী চীরতরে অদৃশ্য হয়ে যায়।
মুক্তাগাছার রাজা, মহারাজা, ও জমিদারদের অর্থান্যুকুল্যে, সক্রিয় পৃষ্ঠপোষকতায় মহারাজা সূর্যকান্ত আচার্য্য চৌধুরীর বাড়ির পূর্ব দিকে নির্মিত গোপাল পালের এই বিখ্যাত মন্ডার দোকানের দালান ঘরটি আজও মিষ্টান্ন জগতে বাংলা ও বাঙালীর অতীত ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক হিসেবে অম্লান।

গোপাল পাল বাংলা ১২০৬ ও ইংরেজী ১৭৯৯ সালে জন্ম গ্রহন করেন এবং বাংলা ১৩১৪ ও ইংরেজী ১৯০৭ সালে মৃত্যু বরন করেন। তিনি প্রায় ১০৮ বছর জীবিত ছিলেন। নবাব সিরাজ- উ- দ্দৌলার পতনের পর মুর্শিদাবাদ ছেড়ে গোপাল পালের পিতা মালদাহ রাজশাহীতে বসতি স্থাপন করেন। পরে গোপাল পাল রাজশাহী থেকে মুক্তাগাছা এসে মুক্তাগাছা থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার উত্তরে তারাটি গ্রামে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Close