তাজা খবর:
Home / breaking / ইসলামে তথ্য যাচাইয়ের গুরুত্ব
ইসলামে তথ্য যাচাইয়ের গুরুত্ব

ইসলামে তথ্য যাচাইয়ের গুরুত্ব

মেফতাহ আল তামিমঃ-পবিত্র কুরআন মাজিদে তথ্য যাচাই প্রসঙ্গ : যারা তথ্য যাচাই কাজে নিয়োজিত থাকবেন কিংবা তথ্য সম্পর্কিত বিষয়ে দায়িত্ব পালন করবেন তাদের প্রতি আল্লাহ পাকের পক্ষ থেকে বিধান হলোÑ ‘হে মুমিনরা! তোমরা আল্লাহর জন্য ন্যায়ের সঙ্গে সাক্ষ্যদানকারী হিসেবে সদা দণ্ডায়মান হও। কোনো কওমের প্রতি শত্রুতা যেন তোমাদেরকে কোনোভাবে প্ররোচিত না করে যে, তোমরা ইনসাফ করবে না। তোমরা ইনসাফ করো, তা তাকওয়ার নিকটতর’ (সূরা আল মায়েদা, আয়াত-৮)। পৃথিবীতে একদল লোক আছে যারা পৃথিবীতে বসবাসকারীদের শান্তিতে থাকতে দেয় না, অশান্তি সৃষ্টি করাই যেন এদের কাজ। এদের প্রসঙ্গে আল্লাহ পাক বলেন, ‘ওদেরকে যখন বলা হয়, তোমরা পৃথিবীতে অনাচার করো না, তারা বলে, আমরা তো শান্তি স্থাপনকারী। জেনে রাখো, ওরাই অনাচার বিস্তারকারী, কিন্তু ওদের চেতনা নেই’ (সূরা বাকারা, আয়াত-১২)।
পৃথিবীতে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বিনষ্টকারী মাফিয়া চক্র, তাদের দোসররা, এসব কুকর্মের নেপথ্য কুশীলবরা সর্বপ্রথম মিথ্যা সংবাদকে ব্যাপক প্রচার করে। মিথ্যা রটনাকে এমনভাবে কৌশলে উপস্থাপন করে তা সাধারণ মানুষের বোঝার উপায় থাকে না। মিথ্যা সংবাদ সমাজের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে, ঐক্য বিনষ্ট করে, হানাহানি ও রক্তপাত ঘটানোর প্রতি উৎসাহিত করে। যারা প্রকৃত জ্ঞানী ও বিদ্যান, সমাজের হিতাকাক্সক্ষী, যারা নেতৃত্ব দেন তাদের প্রতি নির্দেশনা হিসেবে পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ! তোমাদের কাছে যদি কোনো ফাসেক ব্যক্তি কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তা যাচাই করো। অজ্ঞতাবশত কোনো গোষ্ঠীকে আক্রান্ত করার আগেই, (না হলে) তোমরা কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত হবে’ (সূরা হুজুরাত, আয়াত-৬)। সামাজিক স্থিতিশীলতা রক্ষা, সমাজের শান্তি যাতে বিনষ্ট না হয় এ বিষয়ে লোকদের প্রতি নির্দেশ দিয়ে আল্লাহপাক বলেন, ‘তোমরা পরস্পরের দোষ চর্চা করো না। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের মাংস খেতে পছন্দ করবে? নিশ্চয়ই তোমরা তা অপছন্দ করবে। তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমাশীল ও দয়ালু’ (সূরা হুজুরাত, আয়াত-১২)।
সত্য প্রচার সম্পর্কে কুরআনের নির্দেশনা : আল্লাহপাক বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সঠিক কথা বলো’ (সূরা আহজাব, আয়াত-৭০)। অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, ‘যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তার অনুসরণ করো না। নিশ্চয়ই কান, চোখ, অন্তরের প্রতিটি বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হবে’ (সূরা বনি ইসরাইল, আয়াত-৩৬)। তিনি আরো বলেন, ‘তোমরা সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশিয়ে দিও না এবং জানা সত্ত্বেও সত্যকে তোমরা গোপন করো না। আর সালাত কায়েম করো, জাকাত দাও এবং সালাতে অবনত হও তাদের সাথে, যারা অবনত হয়’ (সূরা বাকারা, আয়াত : ৪২-৪৩)। ‘হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় করো আর সত্যবাদীদের শামিল হও’ (সূরা আত তাওবা, আয়াত-১১৯)। সংবাদ প্রচারের আগে করণীয় কী হবে, দায়িত্বশীলদের দৃষ্টিগোচর করার প্রতি নির্দেশনা এবং সংবাদের যথার্থতা নিরূপণ প্রসঙ্গে আল্লাহপাক বলেন, ‘যখন তাদের কাছে নিরাপত্তা বা ভয়ের কোনো সংবাদ পৌঁছে, তখন তারা তা প্রচার করে। যদি তারা তা (সংবাদটি) রাসূল বা তাদের দায়িত্বশীল ব্যক্তির দৃষ্টিগোচর করত, তবে তাদের (দায়িত্বপ্রাপ্ত) অনুসন্ধানকারীরা তার যথার্থতা নির্ণয় করতে পারত। তোমাদের প্রতি যদি আল্লাহর অনুগ্রহ ও রহমত না থাকত, তবে সামান্যসংখ্যক ছাড়া সবাই শয়তানের অনুসরণ করত’ (সূরা আন নিসা, আয়াত-৮৩)।
গুজব ও মিথ্যা প্রসঙ্গে হাদিসের বর্ণনা : আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা: থেকে বর্ণিতÑ একটি হাদিসে গুজবকে শয়তানের কাজ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ‘শয়তান মানুষের রূপ ধরে তাদের কাছে আসে এবং তাদের মিথ্যা কথা শোনায়। অতঃপর লোকজন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং তাদের কেউ বলে, আমি এমন এক ব্যক্তিকে এ কথা বলতে শুনেছি, যার চেহারা চিনি, কিন্তু নাম জানি না’ (সহিহ মুসলিম)। রাসূলুল্লাহ সা: বলেন, ‘সব শোনা কথা প্রচার ব্যক্তির মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য যথেষ্ট’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস-৪৯৯২)। হজরত আবদুুল্লাহ বিন আমর রা: থেকে বর্ণিতÑ রাসূলুল্লাহ সা: বলেন, ‘যে ব্যক্তি জ্ঞাত বিষয়কে গোপন করল কিয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা তাকে আগুনের লাগাম পরাবেন’ (সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস-৯৬)। আলী ইবনে আবু তালেব রা: থেকে বর্ণিতÑ তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সা:-এর কাছ থেকে মুখস্থ করেছি, ‘যে কাজের ব্যাপারে মনে সন্দেহ হয়, সে কাজ ছেড়ে দিয়ে সন্দেহমুক্ত কাজ করো। কেননা, সত্য প্রশান্তিকর এবং মিথ্যা দ্বিধাযুক্ত’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস-২৫১৮)।
সত্য প্রচার প্রসঙ্গে হাদিসের বর্ণনা : রাসূলুল্লাহ সা: বলেন, ‘নিশ্চয়ই সত্য মানুষকে পুণ্যের পথনির্দেশ করে’ (আল জামিউ বাইনাস সাহিহাইন, হাদিস-২৮৭)। রাসূলুল্লাহ সা: বলেন, ‘তোমরা সত্যকে অবলম্বন করো। কারণ সত্যবাদিতা ভালো কাজে উপনীত করে। আর ভালো কাজ উপনীত করে জান্নাতে। মানুষ সত্য বলে ও সত্যবাদিতার অন্বেষায় থাকে, একপর্যায়ে সে আল্লাহর কাছে সত্যবাদী হিসেবে লিখিত হয়ে যায়। আর মিথ্যা থেকে দূরে থাক। কারণ মিথ্যা উপনীত করে পাপাচারে। আর পাপাচার উপনীত করে জাহান্নামে। ব্যক্তি মিথ্যা বলে ও মিথ্যার অন্বেষায় থাকে, এভাবে একসময় আল্লাহর কাছে সে চরম মিথ্যুক হিসেবে লিখিত হয়ে যায়’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস-২৬০৭)। রাসূলুল্লাহ সা: বলেন, ‘যে চুপ থাকে সে মুক্তি পায়’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস-২৫০১)।
সত্য প্রচারের সুফল : বেশির ভাগ মানুষ তাদের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা কিংবা জ্ঞানের দৈন্যতার দরুন দেশ জাতি ধর্ম এমনকি প্রজন্মের জন্য ক্ষতিকর ‘তথ্যপ্রবাহ’ সম্পর্কে একেবারে উদাসীন। সত্য সংবাদ প্রচারের ফলে মানুষ সুরক্ষায় করণীয় বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে। সত্য প্রচারের ফলে গণমানসিকতায় ‘ইতিবাচক মূল্যবোধ’ গড়ে ওঠে। শাসক ও শাসিতের মধ্যে সহযোগিতামূলক মানসিকতা গড়ে উঠে। সত্য প্রচারের কারণে দেশ ও জাতির ক্রম অগ্রগতি বৃদ্ধি পেয়ে জাতি সমৃদ্ধশালী হয়ে উঠে। ‘সঠিক তথ্য সেরা জাতির সমৃদ্ধির পথ্য’ এ মন্ত্র প্রকৃত অর্থে সত্য সংবাদ প্রচারের মাধ্যমে অগণিত সুফল দান করে।
সত্য প্রচারে পরকালীন ভাবনা : সংবাদ প্রচার কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিদের পরকালীন ভাবনা তাদেরকে সত্য প্রচারে উৎসাহিত করে। মহান প্রভুর কাছে জবাবদিহি করতে হবে এ ভাবনা যদি অন্তরে জাগ্রত হয়, সুস্থ বিবেকবোধ, ধর্মীয় অনুশীলন, ধর্মগ্রন্থের নির্দেশনা যদি মান্য করে তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কখনোই মিথ্যা প্রচার করতে পারে না। যারা মিথ্যা প্রচার করে, কিয়ামতের ময়দানে তাদেরকে মিথ্যা প্রচারের কারণে জবাবদিহি করতে হবে। পবিত্র কুরআন মাজিদের এ বর্ণনাটি বেশ প্রণিধানযোগ্য। আল্লাহপাক বলেন, ‘আজ আমি তাদের মুখে মোহর এঁটে দেবো তাদের হাত আমার সাথে কথা বলবে এবং তাদের পা তাদের কৃতকর্মের সাক্ষ্য দেবে’ (সূরা ইয়াছীন, আয়াত-৬৫)। আল্লাহপাক আরো বলেন, ‘অবশ্যই তোমাদের ওপর তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত আছে। সম্মানিত আমল লেখকবৃন্দ। তারা জানে যা তোমরা করো’ (সূরা আল ইনফিতার, আয়াত : ১০-১২)।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Close