তাজা খবর:
Home / Uncategorized / এসএসসি পরীক্ষা: মানবিক পুলিশ, ম্যাজিস্ট্রেটের স্বেচ্ছাচারিতা ও একটি ধর্ষণ
এসএসসি পরীক্ষা: মানবিক পুলিশ, ম্যাজিস্ট্রেটের স্বেচ্ছাচারিতা ও একটি ধর্ষণ

এসএসসি পরীক্ষা: মানবিক পুলিশ, ম্যাজিস্ট্রেটের স্বেচ্ছাচারিতা ও একটি ধর্ষণ

রাফসান গালিব:

যাক, সকল কাঁটা ধন্য করে ফুটলো ফুল অবশেষে। সারা দেশে ৩ হাজার ৭৯০টি কেন্দ্রে বিশ লক্ষাধিক শিক্ষার্থী পরীক্ষায় বসলো এবার। অন্যবার সকাল ১০টায় পরীক্ষা শুরু হলেও এবার যানজটের কথা বিবেচনা করে বেলা ১১টায় পরীক্ষা শুরু হয়। গত ডিসেম্বরে রাজধানী শহরে যানজটে এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের নাকাল হওয়ার ঘটনা বেশ আলোচনা তৈরি করেছিল। যানজটে আটকে পড়ে কেন্দ্রে পৌঁছতে দেরি হওয়ায় ঢুকতে দিতে না চাওয়ার বেশ কিছু ঘটনাও ঘটে। সেসময় প্রথম আলোতে প্রকাশিত একটি ছবিতে দেখা যায়, পরীক্ষার্থী সন্তানকে কেন্দ্রে ঢুকতে দেওয়ার জন্য বন্ধ কলেজগেটের সামনে অনুনয়-বিননয় করছেন এক মা। করোনার পর স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরে আসায় রাস্তায় পরিবহনের চাপ বেড়ে যাওয়া এবং রাজধানীর চলমান বড় বড় প্রকল্পগুলোর কারণে সৃষ্ট যানজট মারাত্মকভাবে ভুগিয়েছিল পরীক্ষার্থীদের। সেদিক দিয়ে বাড়তি সময় দিয়ে এবারের এসএসসি পরীক্ষার শুরু করাটা ভালো সিদ্ধান্ত ছিল বলা যায়।

এরপরেও ঢাকার যানজট বলে কথা। যাকে কোনো নিয়মের মধ্যে কখনো বাধা যায় না। তবে সেখানে দুশ্চিন্তামুক্ত করতে এগিয়ে এসেছে পুলিশ। প্রথম দিনই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ প্রশংসিত হয়েছেন একজন পুলিশ কর্মকর্তা। ভুল করে অন্য কেন্দ্র চলে যাওয়া এক পরীক্ষার্থীকে সঠিক সময়ে নিজ কেন্দ্রে পৌঁছে দিয়েছেন তিনি।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) উত্তরা পশ্চিম থানা চালু করেছে পরীক্ষার্থীদের জন্য ‘সাপোর্ট’ নামে বিশেষ এক সেবা চালু করেছে। যানজটপ্রবণ এলাকায় রাখা হয়েছে দশটি মোটরসাইকেল। এ ছাড়া আলাদা তিনটি গাড়ি প্রস্তুত রাখা হয়েছে। কোনো পরীক্ষার্থী ভুলে প্রবেশপত্র ফেলে এলে বা ভুল কেন্দ্রে চলে গেলে পরীক্ষার্থীদের দুশ্চিন্তামুক্ত করছে সেই সেবা। যানজটে পড়লে পরীক্ষার্থীদের সঠিক সময়ে কেন্দ্রে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। গতকাল অন্তত ১৫ জন পরীক্ষার্থীকে এমন সেবা দিয়েছেন তাঁরা। পরীক্ষাজুড়ে এ কার্যক্রম চালু রাখা হবে বলে পুলিশ জানিয়েছে। প্রায়দিনই কোনো না কোনো ঘটনায় পুলিশের কর্মকাণ্ড নিয়ে সমালোচনার মাঝে উত্তরা পশ্চিম থানার এ কার্যক্রম নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। বড় শহরগুলোতে যানজটপ্রবণ এলাকাগুলোতে এভাবে পরীক্ষার্থীদের সহায়তায় এগিয়ে আসতে পারে স্থানীয় থানা-পুলিশ।

একই দিন আরেকটি ঘটনাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোড়ন তুলে। সেটি প্রশংসার নয়, নিন্দার। সেটি অবশ্যই রাজধানীতে নয়, দেশের আরেক প্রান্ত পটুয়াখালীতে। সেখানকার গলাচিপায়  খারিজ্জমা ইসহাক মাধ্যমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে নয় পরীক্ষার্থীকে বহিষ্কার করেছেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. ইসমাইল। পরীক্ষার্থীরা অসদুপায় অবলম্বন করলে তাদের এমন শাস্তি দেওয়াই যায়। কিন্তু মো. ইসমাইলের এমন সিদ্ধান্ত অনেকেই মেনে নিতে পারছেন না। পরীক্ষা শুরুর পাঁচ মিনিটের মধ্যেই এসব শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার করেন তিনি।

দৈনিক যুগান্তরের এক প্রতিবেদন জানাচ্ছে, তখনও রোল নম্বর এবং রেজিস্ট্রেশন নম্বর ছাড়া কিছু লেখেনি সাতজন পরীক্ষার্থী। বাকি দুই পরীক্ষার্থীর একজন দুটি উত্তর এবং অপরজন তিনটি উত্তরের বৃত্ত ভরাট করেছে কেবল। এর মধ্যেই তাদের বহিষ্কার করা হয়। ম্যাজিস্ট্রেট ইসমাইল কারও অনুরোধ না শুনে একতরফাভাবে এসব পরীক্ষার্থীকে বহিষ্কার করেন। পরীক্ষার্থীরা তাঁর পা ধরলেও রেহাই পায়নি। এক পরীক্ষার্থীর ভাষ্য, সকালে বৃষ্টির মধ্যে ভিজে তাড়াহুড়ো করে শেষ সময়ে হলে প্রবেশ করে সে, খাতা পাওয়ার পর দাঁড়িয়ে স্বাভাবিক হয়ে সবকিছু ঠিক করে বসার সময় তাকে বহিষ্কার করা হয়। তবে এক টিভি চ্যানেলে ম্যাজিস্ট্রেট ইসমাইল বলেছেন, পরীক্ষার্থীরা প্রশ্নপত্র অদল-বদল করার কারণে এমন শাস্তি দিয়েছেন তিনি। সেটি হয়ে থাকলেও কোনো লঘু শাস্তি দিয়ে পরীক্ষার্থীদের সতর্ক করে দিতে পারতেন তিনি।

গত আড়াই বছর ধরে শিক্ষার্থীরা এমনিতেই তাদের শিক্ষাজীবন নিয়ে নানাভাবে বিপর্যস্ত। সেখানে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের অবিবেচক সিদ্ধান্তে নয় শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনে অনিশ্চয়তা নেমে আসলো বলা যায়। এদের কেউ কেউ হয়তো ঝরেও পড়বে। গোটা বিষয়টি তাদের পরিবারকেও আতঙ্কিত করে তোলেছে। যুগান্তরকে সোহরাব সরদার ও চুন্ন মিয়া নামে দুজন অভিভাবক বলেন, ‘আমরা এখন ছেলে মেয়েদের পাহারা দিয়ে রাখছি, তারা অনেক কান্নাকাটি করে। যখন-তখন আত্মহত্যার মতো দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।’ মো. ইসমাইল কি বুঝতে পারছেন, তাঁর ক্ষমতাচর্চা ও স্বেচ্ছাচারিতা কতগুলো পরিবারের মধ্যে কী সংকট তৈরি করেছে?

এবারের এসএসসি পরীক্ষায় প্রথম দিনেই ৩৩ হাজার ৮৬০ জনের অনুপস্থিতি ছিল মানে তারা পরীক্ষায় অংশ নেয়নি। এসএসসিতে এত বিপুলসংখ্যক পরীক্ষার্থী এর আগে অনুপস্থিত থাকেনি। বিষয়টি খুবই উদ্বেগজনক। সেই অনুপস্থিতি মধ্যে একজন ছিল লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার এক মেয়ে। ১ সেপ্টেম্বর বেলা সাড়ে ১১টায় পরীক্ষার প্রবেশপত্র সংগ্রহ করার কথা বলে বাড়ি থেকে সে বের হয়ে দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়। এ ঘটনায় দুজন ধর্ষককে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। প্রতিদিনই ঘটছে ধর্ষণের ঘটনা। আমাদের নির্বিকার জীবনে সেসব কোনোভাবেই যেন রেখাপাত করে না। ফলে শিক্ষাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার প্রবেশপত্র সংগ্রহ করতে গিয়েও দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হতে হয় একজন পরীক্ষার্থীকে। এটিই কি তবে নিয়তি হলো আমাদের মেয়েদের!

  • রাফসান গালিব প্রথম আলোর সহসম্পাদক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Close