তাজা খবর:
Home / breaking / একহাতে বোনকে ধরে আরেক হাতে দিয়ে আধা কিলোমিটার সাঁতরে বাঁচালো ছোট ভাই
একহাতে বোনকে ধরে আরেক হাতে দিয়ে আধা কিলোমিটার সাঁতরে বাঁচালো ছোট ভাই

একহাতে বোনকে ধরে আরেক হাতে দিয়ে আধা কিলোমিটার সাঁতরে বাঁচালো ছোট ভাই

মো. রুবেল ইসলাম, পঞ্চগড় প্রতিনিধি:

পঞ্চগড়ের বোদায় নৌকাডুবির ঘটনায় ছোট ভাই দর্প নারায়ণ রায়ের (১২) সাহসিকতায় নতুন জীবন ফিরে পেয়েছে বড় বোন ঈশিতা কলি রায় (১৬)। বদ্বেশ্বরী মন্দিরের মহালয়ার পূজা দেখতে যাওয়ার জন্য দুর্ঘটনার দিন ওই নৌকাতেও উঠেছিল দর্প ও ঈশিতা। সেদিনের ওই নৌকাডুবির ঘটনায় অনেক মানুষ মারা গেলেও ছোট দর্প নারায়ণ ডুবে যাওয়া বড় বোনকে সাঁতরে এবং টেনে নদীর তীরে আনে।

নৌকা ডুবির ঘটনায় জেলা জুড়ে শোকের মাতম চললেও এই দুই ভাই-বোনের নতুন জীবন ফিরে পাওয়ার গল্প এখন সবার মুখে মুখে।

জানা যায়, ঘটনার মূল নায়ক ঈশিতার ছোট ভাই দর্প নারায়ণ। ১২ বছরের শিশু ছোট দর্প ডুবে যাওয়া ১৬ বছর বয়সী বড়বোন ঈশিতাকে সাতরে নদীর কিনারায় এনে মৃত্যু হাত থেকে রক্ষা করেছে। ঈশিতা মাড়েয়া মডেল হাই স্কুল থেকে এবার এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে। পাড়া প্রতিবেশী ছাড়াও তাদের আত্মীয়-স্বজনরাও বাড়িতে ভিড় করছেন নৌকাডুবির ঘটনায় বেঁচে যাওয়া দুই ভাই-বোনকে দেখতে।

তবে ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে এখনও আঁতকে উঠছে দর্প নারায়ণ রায়। মাড়েয়া মডেল হাই স্কুলের ৬ষ্ঠ শ্রেণীর এই শিক্ষার্থী জানায়, বদ্বেশ্বরী মন্দিরে মহালয়া পূজা উৎসবে অংশ নিতে প্রতি বছরের মতো রোববার দুপুরেও দুই ভাই-বোন ওই নৌকায় ওঠে। সে সময় দর্প ও ঈশিতা একে অন্যের হাত ধরে নৌকার পেছনের দিকে ইঞ্জিনের কাছে বসেছিল। কিন্তু কিছু দূর যাওয়ার পর অতিরিক্ত যাত্রীর কারণে নৌকা দুই দিকে দোল খেতে শুরু করে এবং দুই পাশ দিয়ে পানি উঠতে শুরু করে। এ সময় একে অন্যের মধ্যে অস্থিরতা শুরু হয়ে যায়। এক পর্যায়ে নৌকাটি পানিতে তলিয়ে যায়। অন্য যাত্রীদের সঙ্গে দুই ভাইবোনও পানিতে ডুবে যায়। তবে সাঁতার জানা থাকার কারণে দর্প দ্রুত সাঁতরে একদিকে চলে যায়। তার বড় বোন ঈশিতাও সাঁতরে আরেক দিকে চলে যায়। এ সময় বাঁচার চেষ্টায় একে অপরকে জড়িয়ে ধরলে আরও বেশি মানুষ ডুবে যায়।

বাবা-মার সঙ্গে দর্প নারায়ণ রায় ও ঈশিতা কলি রায়।

দর্প নারায়ণ রায় জানায়, নদীর পানিতে সাঁতার কাটার সময়ও সে তার বড় বোন ঈশিতাকে খুঁজতে থাকে। এক পর্যায়ে বড় বোনের জামা দেখতে পেয়ে কাছে গিয়ে দেখে ঈশিতা উপুড় হয়ে নিস্তেজ অবস্থায় পানিতে ভাসছে। পরে খরস্রোতা নদীতে বোনকে টেনে দীর্ঘ আধা কিলোমিটার দূরে এসে তীরে ওঠেন। ততক্ষণে নদীর তীরে দাঁড়িয়ে অনেক মানুষ নৌকা ডুবির ঘটনা দেখছিলেন। ওই সময় সেখানে থাকা তাদের প্রতিবেশী মামা বাসুদেব এবং আরেক প্রতিবেশী ভাই (দাদা) মিলনকে ডেকে বড়বোন ঈশিতাকে বাঁচানোর জন্য আকুতি জানায়। তারা ঈশিতাকে নিস্তেজ অবস্থায় উদ্ধার করে বোদা উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসা শেষে রাতেই বাড়ি ফিরে যায় ঈশিতা কলি রায়। এরপর সে সোমবার ও মঙ্গলবারের এসএসসি পরীক্ষাতেও অংশ নেয়।

ছোট ভাইয়ের দুর্দান্ত সাহসিকতায় নতুন জীবন ফিরে পাওয়া ঈশিতা কলি রায় বলেন, নৌকা যখন ডুবে যাচ্ছিল, অনেকের মত আমিও পানিতে তলিয়ে যাই। তবে প্রথম দিকে সাঁতার কেটে তীরে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু মানুষের চাপাচাপি আর ভিড়ের কারণে বেশি দূর যেতে পারিনি। আমিও পানিতে তলিয়ে যাই। এরপর কীভাবে কী হয়েছে আর কিছু মনে নেই। পরে বুঝতে পারি হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছি। পরে শুনেছি, আমার ছোট ভাইয়ের জন্যই আমি নতুন জীবন ফিরে পেয়েছি।

ঈশিতার ছোটভাই দর্প নারায়ণ রায় বলেন, নৌকা ডুবে যাওয়ার পর আমি সাঁতার কেটে দূরে চলে যাই। পরে বুঝতে পারি আমার বোন সঙ্গে নেই। সাঁতার কেটেই আমি দেড় দুইশ মানুষের মাঝে আমার বড় বোনকে খুঁজতে শুরু করি। এক পর্যায়ে একটু দূরে বোনের জামা দেখে বুঝতে পারি সে পানিতে উপর হয়ে ভাসছে। আমি তার কাছে গিয়ে দেখি সে নিস্তেজ হয়ে আছে। পরে তাঁর হাত ধরে টেনে সাঁতার কেটে আধা কিলোমিটার দূরে গিয়ে তীরে উঠি। সেখান থেকে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।

পেশায় দলিল লেখক দর্প-ঈশিতার বাবা কৈলাশ চন্দ্র বর্মণ ও গৃহিনী মা সরস্বতী রানী রায় বলেন, নৌকা ডুবির ঘটনায় এতগুলো মানুষ মারা গেছে ভাবতেই বুকটা হাহাকার করে ওঠে। এরমধ্যে কীভাবে আমাদের কলিজার টুকরা দুইটা নতুন জীবন ফিরে পেয়েছে সেটা ঈশ্বরই জানেন। তবে আমার ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ুয়া ওইটুকু ছেলে তার বড় বোনকে নিয়ে সাঁতরে নদীর কিনারায় যেতে পেরেছে, এটা আমাদের কাছে অলৌকিক মনে হয়েছে। ভগবান নিজ হাতে দুই ভাই-বোনকে নতুন জীবন দান করেছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Close